শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

কুমির ও শেয়ালের গল্প

আশরাফ আলী চারু

এক ছিলো কুমির ও এক ছিলো শেয়াল। তারা একে অপরকে খুব বিশ্বাস করতো। আর সেই বিশ্বাস থেকেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। শেয়াল খাবার সংগ্রহ করতে পারলে কুমিরকে দাওয়াত করে খাওয়াতো। আর কুমির যদি শিকার করতে পারতো তবে শেয়ালকে বাদ রেখে খেতো না। এভাবে তাদের বেশ ভালোভাবেই দিন কাটছিলো। কিন্তু একদিন সব এলোমেলো হয়ে গেলো।
কুমির একটা বড় মাছ ধরেছিলো। শেয়ালকে দাওয়াতও দিয়েছিলো। কিন্তু শেয়াল আসতে দেরি করছিলো বলে সে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত থাকায় মাছের মাথার অংশ খেয়ে নিলো। শেয়াল এসে যখন মাছের মাথা দেখতে না পেল তখন বিরক্ত হয়ে গেলো। রাগারাগি করলো। নানারকম কথা শোনালো। কুমির কিছুই বুঝতে পারল না। শুধু মনে মনে বললো, দাওয়াত না করাই ভালো ছিলো। শেয়াল সেই মাছ না খেয়ে বন্ধুত্ব ভেঙ্গে দেওয়ার কথা শুনিয়ে বাসায় ফিরে গেলো। তাদের মধ্যে এই ঘটনা ঘটার সময় একটা জলহস্তী সব দেখছিলো এবং শুনছিলো। আর এই সুযোগ নিয়ে সে শেয়ালের বাসায় গিয়ে বললো- কুমিরটা তোমাকে দেখতেই পারে না। আরো কত কী খায়! তোমাকে ওসব দেখায় কি? তুমি কেন পড়ে আছ তার সাথে? তুমি কি কম! চার পায়ে কতদেশ ঘুরে বেড়াও তুমি। আর সে! হাঁটার সময় লেজটাই সামলাতে পারে না। মাটি ঘেঁষে ঘেঁষে গড়িয়ে যায়। জলহস্তীর কথা শুনে শেয়াল আরও নানা কু কথা বলে দিলো কুমিরকে শোনানোর জন্য। জলহস্তী ফিরে এসে কুমিরের বাসায় গিয়েও শেয়ালের নানাবিধ কুৎসা বর্ণনা করলো। যার ফলে দু’জনের সম্পর্ক শেষই হয়ে গেলো বলা চলে। জলহস্তীর মনোবাসনা পূরণ হলো। কারণ সে তাদের এই মধুর বন্ধুত্বকে ভালো চোখে কোনদিনই দেখে নাই।
দুর্ভাগ্য! কিছু দিন যেতে না যেতেই কুমিরের ভীষণ অভাব দেখা দিলো। পানি খেতে নদীর ধারে কোন প্রাণী আসে না। নদীর মাছগুলো কোথায় যেন পালিয়ে থাকে। ক্ষুধার্ত কুমির শেয়ালের স্মরণাপন্নও হতে পারে না। শেয়াল তো ভুল বুঝে সম্পর্ক ভেঙ্গে দিয়েছে। জলহস্তীর কাছে কতগুলো কু কথা বলে পাঠিয়েছে।
শেয়ালের কাছে না গিয়ে কিছু একটা করে বাঁচতে হবে। এই মনোভাব ও আশা নিয়ে ডাঙ্গায় উঠে সে খাবার খুঁজতে শুরু করলো। সামনে পড়ল শেয়াল। শেয়াল বললো- এখন কেমন লাগে বন্ধু, সেদিন মাছের মাথাটা খেয়ে ভাব নিয়েছিলে তাই না? দেখলে তো অভাব এলে বন্ধুর কাছেই আসতে হয়। শেয়ালের কথা শুনে কুমির কষ্ট পেল। সে বললো- ভাই, আমি তোমার কাছে খাবারের সাহায্য চাইতে আসিনি। কেন কষ্ট দিচ্ছ আমায়!
এবার শেয়াল কুমিরের সাথে বড় একটা ভাব নিলো। একই সাথে মনে মনে একটা প্রতিহিংসা পূরণ করতে কুমিরকে কিছু খাওয়াবে বলে অনুনয় বিনয় করে বাসায় নিয়ে গেলো। কুমির প্রথম দিকে যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিলেও ক্ষুধার তাড়নায় শেয়ালের বাসায় গেলো। শেয়াল করলো কী, গতকাল চুরি করে আনা মুরগি খেয়ে অবশিষ্ট যা ছিলো তাতে গাছের আঠা মিশিয়ে কুমিরকে খেতে দিলো। দুই একবার কামড় দিতেই কুমিরের দুই চোয়াল আঠায় আটকে গেলো। সে বুঝতে পারলো শেয়াল তার সাথে কী খারাপ কাজটাই না করলো! সে কোন কথা না বলে চলে যেতে আরম্ভ করলো। শেয়াল কুমিরের এই নাজেহাল অবস্থা দেখে হেসে গড়াগড়ি দিতে লাগলো।
এই ঘটনার কিছুদিন পর কুমিরের সুদিন এলো। কুমির বুদ্ধি খাটিয়ে এই সুদিন ফিরে পেয়েছে। কুমির বিছুটি পাতা ও বান্দর হোলা সংগ্রহ করে নদীতে বিছিয়ে রাখে। মাছের গায়ে এসব লাগার পর চুলকানি শুরু হয়। মাছ শরীর ঘষবার জন্য নদীর কিনারের দিকে আসে। তখন সে ইচ্ছেমতো ধরে ধরে খায়। তবে এখন শেয়ালের অভাবের দিন। কোথাও সে খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। কুমিরের কাছে কোন মুখে যাবে? জলহস্তীর কাছে এলো সে। জলহস্তীরও অভাব। দু’জন মিলে গেলো কুমিরের বাসার পাশে। গিয়ে দেখলো পাতার স্তুপ আর আলুর মতো কিসের গাদি। তারা মনে করল এইসব খেয়েই কুমিরের অভাব নেই। দিন দিন সে মোটা হচ্ছে। তারা জানে না এইসবে চুলকানি আছে। জলহস্তী বিছুটি পাতা এবং শেয়াল বান্দর হোলার আলু খাবারের লোভ নিয়ে দু’জনে পরামর্শ করলো।
পরামর্শমতো রাতে তারা বিনা দাওয়াতে এসব খেতে এলো। আলু ভেবে শেয়াল খেল বান্দর হোলা আর জলহস্তী খেল বিছুটি পাতা।
অনেকগুলো খেলো। প্রথমত বুঝতে না পারলেও পেট ভরে খাওয়ার পর চুলকানির মজাটা তারা ঠিকই টের পেল। তারপর তাদের গলা, পেটে ও ঠোঁটে কী  চুলকানির জ্বালা! কোথায় গেলে এই জ্বালা মিটবে তারা জানে না। দৌড়ের উপর দৌড় লাগালো তারা। সেই যে দৌড় লাগালো আর থামাতে পারলো কি না কে জানে! এজন্য কথায় আছে সুখে থাকতে ভূতে কিলায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ